তমসো মা জ্যোতির্গময়:

মাটির প্রদীপগুলো খোঁজার আপ্রাণ চেষ্টা করছে মেয়েটা। রোগা রোগা, ফর্সা দুটো হাত এদিক ওদিক হাতড়ে বেড়াচ্ছে ভেঙ্গে যাওয়া প্রদীপগুলো ফিরে পাওয়ার আশায়। 

গলির এদিকটা বেশ সুনসান, লোকজনের বড় একটা যাতায়াত নেই। সামনেই রেললাইনের ধারে ক’ঘর দরমার তৈরি বস্তিবাড়ী। এলাকায় খবর আছে ওই ঘরগুলোতে সব গুন্ডা-মাওয়ালিদের আড্ডা। মাঝে-মধ্যেই পুলিশের পদধূলি পড়ে ওগুলোতে। সাবধানী ভদ্রলোকেরা তাই এদিকটা এড়িয়েই চলে।

তবে এই মেয়েটা আসে। বেশ ঘন ঘনই আসে। মাঝে মাঝে আবার সঙ্গে করে ক’জন লোক-মহিলা আর কমবয়সী ছেলেমেয়েদেরও নিয়ে আসে। এরা নাকি… কি যেন বলে… ও হ্যাঁ… সমাজসেবী। বিশুদা বলে – সোশ্যাল ওয়ার্কার। সে যাই হোক – ছোটু অতশত বোঝেনা। সে শুধু জানে যে এই মেয়েটা যেদিন আসে সেদিন ভালো খাবার-দাবার পাওয়া যায়। ছোটু একবার চকোলেটও পেয়েছিল। হেব্বি লেগেছিল খেতে! যদিও বেশিরভাগটাই বিশুদা কেড়ে নিয়েছিল। যাকগে! কিন্তু সেই ভালো খাবার আর কদিন? বেশিরভাগ দিনই তো নুন আনতে পান্তা ফুরোয়।

ছোটুর বয়স আট ছুঁই ছুঁই। অভাবের সংসারের চতুর্থ সন্তান হিসাবে, চেহারাটা বয়সের তুলনায় ছোটোখাটই। চোদ্দ-পনেরো বছরের বিশু ‘দাদা’দের সাথে সে গায়ের জোরে পেরে ওঠে না। তাই বিশুদা, কার্তিকদা, ভোলাদা-দের হুটহাট ফাইফর্মাসের হুকুমকে ‘না’ বলার সাধ্য ছোটুর নেই। ছিঁচকে চুরি থেকে ছিনতাইবাজি সবেতেই ওর হাতেখড়ি হয়েছে, দাদাদের কৃপায়। কোনোটাতেই এখনো হাত পাকাতে না পারলেও, দাদারা বলে ছোটুর ছোট ‘সাইজ’টাই নাকি ওর আসল ‘অ্যাডভান্টেজ’। ছোটু নিজে এই ‘অ্যাডভান্টেজ’-এর বিশেষ কিছু বোঝে না; কাজগুলো করে দাদাদের উত্তম-মধ্যম ধোলাই-এর থেকে বাঁচার জন্য। নয়তো চুরির টাকার যা ভাগ ওরা তাকে দেয় তাতে এবেলা খাবার জুটলেও পরের বেলায় জোটে না।

তাই আজ যখন বিশুদারা এই মেয়েটার ব্যাগ ছিনতাই করার কথা বললো, খানিকটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও ছোটু ওদের সঙ্গ নিয়েছিল।


এতক্ষনে রাস্তার ওপরেই বসে পড়েছে মেয়েটা। কার্তিকদার ধাক্কায় হাত থেকে ছিটকে পড়ে যাওয়া গুটিকয় প্রদীপ, বাজি, মোমবাতি আর মিষ্টিগুলো খুঁজে বেড়াচ্ছে অন্ধ মেয়েটার অসহায় হাতদুটো। কাঁদছে মেয়েটা, ককিয়ে উঠছে, “বাচ্চাগুলো… বাচ্চা… ওরা কিছুই পায় না পুজোতে… তাই ক’টা ফুলঝুরি…ওইগুলো…।” 

তাই দেখে হেসেই খুন বিশুদা, কালুদা, কার্তিকদা-রা। মেয়েটা যত কাঁদছে ততই যেন জোর হচ্ছে ওদের হাসি। আরে, ওদের এক ধাক্কাতেই মেয়েটার দীপাবলি চুরমার হয়ে গেছে – তাতে আনন্দ কম! ভোলাদা একটা চকোলেট বোমা জ্বালিয়ে ছুঁড়ে দিলো মেয়েটার দিকে। প্রচন্ড শব্দ করে সেটা পায়ের সামনে ফাটতেই, চমকে উঠলো মেয়েটা। অন্ধকার দু’চোখে নতুন করে নামলো জলের ধারা। আর দ্বিগুন হয়ে উঠলো রেলপাড়ের দাদাদের হাসির রোল। হাসতে-হাসতে রাস্তা থেকে কয়েকটা বাজি তুলে নিয়ে দৌড়ে আঁধারের মধ্যে মিলিয়ে গেল বিশুদারা। কার্তিকদা ছোটুকে ডাক দিল, “চলে আয়।”

কিন্তু ছোটুর পা’দুটো যেন মাটিতে আটকে গেছে। সে জানে এক্ষুনি দাদাদের হুকুম না মানলে পরে কপালে দুঃখ থাকবে। কিন্তু মেয়েটার চোখের জল যেন তাকে আটকে রেখেছে ঠিক ওইখানেতেই। 

দৌড়ে গিয়ে ছোটু সাদা ছড়িটা তুলে নিলো রাস্তা থেকে। তারপর মেয়েটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। একটু শিউরে উঠলো মেয়েটা। ছোটু তড়িঘড়ি হাত ধরে তাকে দাঁড় করাবার চেষ্টা করতে লাগলো। মেয়েটা এতক্ষনে বুঝেছে যে এই মুহূর্তে বিপদের কোনো আশঙ্কা নেই। উঠে দাঁড়াতেই ছোট ছোট দুটো হাত তার হাতে ধরিয়ে দিল তার সর্বক্ষণের অবলম্বন, সাদা ছড়িটা। তারপর তাকে ডান দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়ে একটু দূরে সরে গেল তার সাহায্যকারী। একটা কচি, চাপা কন্ঠস্বর বলে উঠলো, “সোজা হাঁটো, ক’পা গেলেই সামনে বড় রাস্তা। দাঁড়িও না, যাও। তাড়াতাড়ি।” শেষের শব্দটা যেন একটু ধমকের মতোই শোনালো। 

এই ধমকটুকুই বোধয় দরকার ছিল দীপার, সম্বিৎ ফিরে পাওয়ার জন্য। সে তাড়াতাড়ি হাঁটতে শুরু করলো বাচ্চাটার বলে দেওয়া রাস্তায়। কিন্তু হঠাৎ মিলিয়ে আসা হালকা পায়ের শব্দ শুনে দাঁড়িয়ে পড়লো সে। ঘুরে দাঁড়িয়ে, গলাটা একটু তুলে হাঁক পাড়লো, ” ভাই ধন্যবাদ। আমি দীপা। তুমি কে?”

দূর থেকে, ক্ষীণ হয়ে আসা কচি গলায় জবাব এলো, “আলোক।”


দীপা এই ঘটনার পরে আর একা রেলপাড়ের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেনি। সে বুঝেছে – আবেগতাড়িত হয়ে যে কাজটা সে ওইদিন করেছিল, সেটা দুঃসাহসিক হয়নি, বোকামি হয়েছিল। সেদিন যদি আলোক না থাকতো, তার যে কি হতো!

এরপরে বেশ কয়েকবার এনজিও-র অন্যদের সাথে রেলপাড়ে গিয়েও আলোকের খোঁজ পায়নি সে। প্রথমে দীপা আশঙ্কা করেছিল যে তাকে সাহায্য করার জন্য বস্তির বখাটে ছেলেদের হাতে চরম শাস্তি পেতে হয়েছে আলোককে। কিন্তু সেখানকার কিছু কমবয়সী ছেলে-মেয়ে, যারা এনজিও-র নাইট স্কুলে পড়তে আসে, তাদের সাথে কথা বলে দীপা বুঝলো যে ওদের মধ্যে  ‘আলোক’ নামটাই কেউ শোনেনি। একরাশ কৃতজ্ঞতা আর নিরাশা নিয়ে দীপা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে যে তার সাহায্যকারীকে হয়তো আর কোনোদিনই সে খুঁজে পাবে না।

এরপর কেটে গেল বেশ ক’টা মাস। শীত গড়িয়ে বসন্ত এলো। কলেজের পড়াশোনা আর রেলপাড়ের বাচ্ছাদের সঙ্গে এনজিও-র বসন্তোৎসবের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত দীপা। এমনি এক বিকেলে, এক মহিলার আর্ত কান্নায় কিছুক্ষনের জন্য থমকে গেল ও। “দিদিমণি, দিদিমণি… আমার স্যালেটা… আমার স্যালেটারে বাঁসাও… অরে ওরা মাইরা ফ্যালাবে দিদিমণি… আমার স্যালেটারে তুমি বাঁসাও…”

মহিলাকে শান্ত করে পুরো ঘটনাটা জানতে এনজিও-র সদস্যদের বেশ খানিকটা সময় লেগেছিল। মাদক পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে রেলপাড়ের একটি উঠতি কিশোরদের দলকে। আর তাদেরই সাথে ধরা পড়েছে মহিলার আট বছরের ছেলে। “অর কুনো দোষ লাই গো দিদিমণি, বাপ-মরা স্যালে… প্যাটের দায়েই… ওই মি*সেগুলান আমার স্যালেটারে আর রাখলে না গো….”

দীপার হাত ধরে কেঁদেই চলেছে মহিলা। ধীরে ধীরে  মহিলার মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে, দীপা বললো, “মাসি, কি নাম গো তোমার ছেলের?”

“অর বাপ সখ করে নাম রাখসিল গো দিদিমণি – আলোক। আমাদের মতোন ঘরে ওসব নাম হয়, বলো? হেথায় সবাই ‘সোটু’ বলে ডাকে।”

দীপার দৃষ্টিহীন চোখে তখন আশার আলো।


বয়স বেশ খানিকটা কম হওয়ার দরুণ আর অন্য ছেলেদের  স্বীকারোক্তির উপর ভিত্তি করে এটুকু বোঝা যায় যে ছোটু এ কাজের বিন্দুবিসর্গও জানত না। শুধু কিছু বখশিসের আশায় সে পাড়ার ‘দাদাদের’ ফাইফর্মাস খাটছিলো।

এনজিও-র বাবুদের তাকে পুলিশের কাছ থেকে ছাড়িয়ে আনতে বেশি সময় লাগেনি। সে যেদিন ঘরে ফিরলো, সেই মেয়েটা দাঁড়িয়েছিল থানার সামনে – লাল রঙের জামা পড়ে, হাতে সেই সাদা ছড়িটা। মেয়েটার মুখের হালকা হাসিটা কেন যেন ছোটুকে বড় লজ্জায় ফেলে দিল। গলার কাছে কি যেন দলা পাকিয়ে উঠছিল ওর।

ধীরে ধীরে ছোটুর কাছে এগিয়ে এলো মেয়েটা। তার দিকে হাত বাড়িয়ে বললো, “আমায় মনে আছে? আমি…”

“দীপা… দীপাদিদি… আমি ছোটু।”

“না, তুই আলোক। আর আমায় তুই দিভাই বলে ডাকিস। কেমন?”

চোখের কোণ দুটো কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসছিল আলোকের।


“কিছুতেই শোনেনা জানোতো, দিদিভাই! ডাক্তার বারণ করেছেন, বলেছেন ব্লাড সুগারটা একটু বেশির দিকে। কে শোনে কার কথা! আমি কিছু বললেই বলে, ‘আরে বেশি তো খাই না, ওটুকু চলতেই পারে।’ তাই বলছিলাম দিদিভাই এবারে তুমি ওকে কেক-মিষ্টি একটু কম দিও।” ফোনের ওপার থেকে, আলোকের স্ত্রী – স্নেহার অনুযোগ শুনতে শুনতে হেসে ফেলল দীপা।

আলোক – তার সেই বড় বড় সজল চোখের ভীত-সন্ত্রস্ত ভাইটা আজ কত্ত বড় হয়ে গেছে। শুধু চকোলেট খাওয়ার অভ্যেসটা এখনো ছাড়তে পারেনি – হাসিমুখে ভাবে দীপা।

সেদিন আর আজকের মাঝখানে পেরিয়ে গেছে প্রায় বত্রিশটা বছর। ডাক্তার আলোক বেরা আজ মুম্বাই সিটি আই ইনস্টিটিউট অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের ডাকসাইটে অপথালমোলজিস্ট। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও, বিদেশেও বেশ নামডাক আছে তার। বিয়ে করেছে প্রায় দশ বছর হলো। সাত বছরের একটি ফুটফুটে মেয়েও আছে, নাম দীপশিখা। উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছেও সে তার শেকড়টাকে উপড়ে ফেলেনি কিন্তু। খেয়াল রেখেছে নিজের পরিবারের। আজও রেলপাড়ের বস্তিবাসীদের জন্য নিয়মিত সাহায্য পাঠায়, ব্যবস্থা করে ছোটদের সুচিকিৎসা ও সুশিক্ষার।

লোক উপ থেকে মুক্তি পাওয়ার কিছুদিন পর থেকে আলোক দীপার কাছে পড়াশোনা শুরু করে। তার দিভাইয়ের অনুপ্রেরণায় আর এনজিও-র সাহায্যে, আলোক ধীরে ধীরে অতিক্রম করতে থাকে একের পর এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গণ্ডী। যেদিন জয়েন্টের ফল আর ডাক্তার হওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে সে দীপার সাথে দেখা করতে আসে, প্রণাম করে বলেছিল, “তুমি আর একটু অপেক্ষা করো দিভাই। আলো আমি তোমায় দেখাবই।” 

স্নেহ আর গর্বে খাবি খেতে খেতে দীপা বোঝানোর চেষ্টা করেছিল, “বোকা কোথাকার! তুই-ই তো আমার আলো।”

আলোক কথা রেখেছিল। দেরী হলেও, রেটিনাল ট্রান্সপ্লান্ট অপারেশনের সাহায্যে সে তার জন্মান্ধ দিভাইকে দিয়েছে জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার – দৃষ্টির আলো।

“পিমনীইইই…”

স্মৃতির গভীর থেকে হঠাৎ একটা অতি পরিচিত কচি কন্ঠস্বর বর্তমানে টেনে আনল দিপাকে।

“বলো সোনা, আমি শুনছি।”

ফোনের মধ্যে দিয়ে আবারও ভেসে এলো আদুরে গলাটা, ” বাবাকে যেই কেকটা তুমি দেবে না, সেটা কিন্তু ফেলে দিও না। বাবা বলে খাবার নষ্ট করা অন্যায়। ওটা তুমি আমায় দিয়ে দিও। আমি খেয়ে নেব। ও.কে. পিমনী? এখন যাই, প্লেনে উঠতে হবে। সি ইউ সুন।”

হাসিমুখে ফোনটা নামিয়ে রাখে দীপা। আজ আর একটা কালীপুজো। কিন্তু আজকের রাতের উজ্জ্বলতার কাছে হার মেনেছে সেই অতগুলো বছর আগের কালীপুজোর রাতের গহীন অন্ধকার।

আজ বিকেলের মধ্যেই আলোকরা কোলকাতায় এসে পড়বে। তারপর রেলপাড়ের বাচ্ছাদের সাথে হইহুল্লোড়, বাজি ফাটানো, ঠাকুর দেখা, আরো কত কি। তবে দীপার সমস্ত উত্তেজনা, ব্যস্ততা আগামী পরশু দিনটার জন্য। পরশু যে ভাইফোঁটা!


মায়ের হাতে ফোনটা ধরিয়ে দিপু তরতরিয়ে হাঁটা দিলো সিকিউরিটি চেকিং-এর দিকে। বাবার দিকে ঘুরে একবার মিটমিট করে দেখেও নিল। চকোলেট কেকের যুদ্ধে যে সে জিতে গেছে তা জানান দিতে ভুললো না। স্নেহা মুচকি হেসে ওর পিছু নিলো।

পরাস্ত হয়ে আলোক ঘড়িতে একবার চোখ রাখলো। আর ঘন্টাতিনেক। তারপরেই সে ঘরে ফিরবে, রেলপাড়ের সেই অন্ধজগতে নয়। তার আঁধার জীবনে আলো হয়ে আসা – তার আদরের দিভাইয়ের কাছে।

2 Comments Add yours

  1. Good one, waiting for more!

    Liked by 1 person

    1. Debolina says:

      Thank you, Sir. Waiting for more of your amazing photography too!

      Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s